Monday, March 1, 2010

"Mon"-er Manik

মন-এর মানিক

বিপুল দাস






আমরা এই সমাজ, সংসার, এই দেশ, এই কালে বৃত হয়ে রয়েছি কিছু সম্পর্কের জেরে, কয়েকটি সম্পর্কের জোরে। এই সব সম্পর্ক আসলে চিহ্ন। যেমন গ্রাফ-কাগজে একটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক নির্ণয় করা হয় xy অক্ষের প্রেক্ষিতে, তেমন-ই মানুষের অস্তিত্ব। কিন্তু গ্রাফ-পেপার দ্বিমাত্রিক একটি তলমাত্র এবং মাত্র দুটি অক্ষদ্বারাই ওই বিন্দুর অবস্থান সূচিত করা যায়। অথচ এই জীবনের কত না তল, কত কৌণিকতা, কত বিচিত্র তির্যক জীবনযাপন। লক্ষ লক্ষ x এবং y অক্ষের প্রেক্ষিতে আমাদের এই বেঁচে থাকা। এমন কী, কয়েকটি মাত্রা কোন অতলে থেকেও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে, নির্দ্ধারিত করে আমাদের ব্যবহারবিধি। আপাতভাবে মানুষের সেই আচরণের কোনও ব্যাখ্যাই খুঁজে পাওয়া যায় না। আর, কেন মানুষ এমন হয়-- ব্যক্তিমানুষ ও গোষ্ঠিবদ্ধ মানুষের মননক্রিয়ার সেই রহস্যময় আচরণের কারণ-নির্ণায়ক উপাদান কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরস্পর ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে, সেই কেন-এর উত্তর যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প। লেখক তো শুধু খুঁড়ে যান। ব্যক্তিমানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট হোক, বা হাজার বছর ধরে মার খেয়ে মরে থাকা মানুষের জেগে ওঠার ভাষা হোক -- খুঁড়ে যাওয়া বহাল থাকে। সেখানে মার্ক্সবাদী অথবা গান্ধীবাদী লেখক-- এই পরিচয় গল্প পাঠের আগেই বিধিবদ্ধ

র্কীকরণ যেন। পাঠককে প্ররোচিত করে বিশেষ অভিমুখে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে সেই খুঁজে যাওয়া, মানব মনের দুর্গমে সেই তল্লাশ জারি থেকেছে পর্ব থেকে পর্বান্তরে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত শিথিল কাঠামোর মানুষ থেকে চিরকালের মার-খাওয়া ভাঙাচোরা মানুষের কাম, ক্রোধ, ঘৃণা, ভালোবাসা, লোভ, এই শরীরের কামনাবাসনার অপূর্ণতার জন্য কান্না--এ সব-ই যদি মার্ক্স, ফ্রয়েড বা ডারউইনের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যাত হয়, তা হলে সেই গল্প হয় সহজ সরল একটি উদাহরণসহ সেই তত্ত্বের বিশ্লেষণমাত্র। সেখানে কোনও রহস্যময়তা, কোনও সংকেত, কোনও ইশারা থাকে না। ওই ইশারা-মর্মরতার আড়ালে প্রকৃত শিল্প রচিত হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট গল্পে একটি পর্বে দেখতে পাই ব্যক্তি-মানুষের

মনোজগতে যে আপাত রহস্যময়তা কখনও চেনা মানুষকেও অপিরিচিত করে তোলে, বিজ্ঞানের অনুসন্ধিসু দৃষ্টি মনোবিজ্ঞানের চশমায় সেই রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাইছে। পর্বান্তরে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখছি অন্ত্যজ মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, চিরকালের মার খাওয়া মানুষের কথা বলতে গিয়ে সেই অনুসন্ধিসু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতির প্রেক্ষিতে চালিত হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও কোনও গল্পই শিল্পশর্ত অতিক্রম করে শ্লোগানসর্বস্ব লেখা হয়ে ওঠেনি। সেখানেও সমষ্টির ঘুরে দাঁড়ানোর কথা, বিবেকহীন, লোভী,পচাগলা মানুষের কথা বলতে গিয়েও ব্যক্তি-মানুষের অস্তিত্বের সংকটের কথা, কখনও কখনও আপাতভাবে ব্যাখ্যার অতীত তার অদ্ভুত আচরণের কথা অতি নিপুণ শৈল্পিক দক্ষতায় লেখা হয়েছে।

স্রষ্টার অন্তর্দৃষ্টি সব সময়েই মানবমনের সেই গভীর অতলে পৌঁছনোর জন্য, তাকে বোঝার জন্য, তাকে ছোঁয়ার জন্য চেষ্টা করে যায়। আমাদের প্রচলিত সাংসারিক জীবনযাপনের সংজ্ঞা দিয়ে, এক্স এবং ওয়াই অক্ষের প্রেক্ষিতে যার অবস্থান স্পষ্ট বোঝা যায় না। অসহায় মানুষের সেই কান্না, যা হয়তো সে ঢেকে রাখতে চায় পুরনো তোরঙ্গ থেকে বের করে আনা একটা ফর্সা ধুতি আর রিফু করা জামা দিয়ে ( মহাসঙ্গম গল্পের কথা বলছি ), তখন প্রকৃতই তিনি দ্রষ্টা হয়ে ওঠেন। তখন প্রখর যুক্তিবাদী বিজ্ঞানচেতনা আর মানবমনের জটিল রহস্যময়তা-- এই দুই টানাপোড়েনে অস্থির হয়ে ওঠে

শিল্পিত মানস। তখন সেই অস্থিরতার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় শিল্প। শিল্প তো আসলে ঈঙ্গিতময় প্রকাশ, ইশারা ভেঙে ভেঙে বিকশিত হয়ে ওঠা। আর কে না জানে দ্বন্দ্ব ছাড়া বিকাশ হয় না। মানিক

বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের ভুবনে প্রেক্ষিত পাল্টেছে। টালমাটাল সময়ের ভেতর দিয়ে পর্ব থেকে পর্বান্তরে তার যাত্রা। প্রাক-বিশ্বযুদ্ধের এক রকম সময়, যুদ্ধকালীন ত্রস্ত সময় এবং যুদ্ধোত্তর ন্যায়-নীতি-বিবেক

হীন সময়-- সময় একটা বিশেষ মাত্রা হয়ে উঠেছে বটে,(আর সেটাই তো স্বাভাবিক, যে কালের গর্ভে

লেখকের নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস, সেই জল ও বাতাস তো তাকে গ্রহণ করতেই হয়), কিন্তু মানব-মনের সেই গভীর-গোপনে যে রহস্যময়তা মানুষকে মানুষের কাছেই অচেনা করে রাখে, যার খোঁজে কত ছবি আঁকা হল, কত নাটক, গল্প, উপন্যাস, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র নান্দনিক ঐশ্বর্যে বিভাময় হয়ে উঠল, সেই খোঁজটুকু পর্ব থেকে পর্বান্তরে তার গল্পে এতটুকু ম্লান হয় নি বলে আমি বিশ্বাস করি।

তবে ? তার নিজের যে কনফেশন--লিখতে আরম্ভ করার পর জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন আগেও ঘটেছে, মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হবার পর আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে সে পরিবর্তন ঘটাবার প্রয়োজন উপলব্ধি করি।

এখন আমার প্রশ্নঃ যদি মার্কসবাদের সঙ্গে তার পরিচয় না-ই ঘটত, তবে দ্বিতীয় পর্বের গল্পগুলো, উপন্যাসও, যেগুলো সম্পর্কে প্রায়শই শোনা যায়--প্রথম পর্বের রচনায় যে অন্তর্দৃষ্টি, প্রতিভার দীপ্তি ও শিল্পগত সার্থকতা লক্ষ করা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পর্বের রচনায় কমিউনিস্ট

হওয়ার পর থেকে শেষ বারো বছরের রচনায় তার অনেকটাই অনুপস্থিত, কয়েকজন সমালোচকের মতে --সমাজপ্রেক্ষিতের ওপর বেশী জোর দিতে গিয়ে মনের জগ হারিয়ে গেছে অতি সরলীকরণে, মার্কসবাদে দীক্ষিত না হলে দ্বিতীয় পর্বের গল্পগুলো কি তাঁর কনফেশন অনুযায়ী --অনেক ভুলভ্রান্তি, মিথ্যা আর অসম্পূর্ণতা, ফাঁকিতে ভরা থাকত--- মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে তিনি যা স্পষ্ট ও আন্তরিকতার সঙ্গে বুঝতে পারেন নি। পাঠকও কি বুঝত না কোনটা ফাঁকির, কোনটা অসম্পূর্ণতার বা ভুলভ্রান্তির গল্প। তেমন গল্প বাংলা সাহিত্যে হাজার হাজার লেখা হয়েছে। হবেও হয়তো। তেমন গল্প পাঠক সহজেই চিনে নিতে পারে। তেমন গল্পের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক মনে রাখেনি। সাহিত্যের ইতিহাসের স্রোতে খড়কুটোর মত ভেসে গেছে। কিন্তু অতসীমামী, সর্পিল, শিপ্রার অপমৃত্যু, মহাসঙ্গম, মাটির সাকী পাঠক কি বর্জন করেছে। এসব গল্প কি বাংলা ছোটগল্পের মঞ্জুষায় মনিমুক্তা নয়। কোথায় কোথায় মিথ্যা, ফাঁকি, অসম্পূর্ণতা। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে হারাণের নাতজামাই বা ছোট বকুলপুরের যাত্রী গল্পদুটি একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, কিন্তু তিনি মার্কসবাদে দীক্ষিত নন। এই লেখকের অতসীমামী ও অন্যান্য গল্প, প্রাগৈতিহাসিক, অমৃতস্য পুত্রা, মিহি ও মোটা কাহিনি, সরীসৃপ, বৌ, সহরতলী, অহিংসা, ধরাবাঁধা জীবন গল্প সঙ্কলনগুলো প্রকাশিত হয়েছে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪১- এর মধ্যে। তাহলে কি , যে গল্পদুটোর কথা বললাম, সে দুটি ফাঁকি এবং ভুলভ্রান্তিতে ভরা গল্প হত। সমষ্টির প্রতিবাদী চেতনার চারিত্র্য-লক্ষণ হারিয়ে ব্যক্তির সংকটের গল্পই হত, তবে কি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিভার কোনও স্পর্শ পেত না। সে কি অসাধারণ দুটি গল্প হয়ে উঠতে পারত না। মার্কস-মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার আগের পর্বে লেখা পড়ে তো সে কথা মনে হয় না। প্রাক-কমিউনিস্ট পর্বে সেই ভাঙাচোরা মানুষের কথা-ই তো তার কলমে বারে বারে এসেছে। আত্মহত্যার অধিকারে নীলমনি,শ্যামা, নিভা পৃথিবী-ভেসে-যাওয়া বৃষ্টির মাঝে আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে দেখতে পায় একজন মানুষকে, শিয়রে মৃত্যু নিয়ে যে অপেক্ষা করে আছে। পিসে হাপরের মত শ্বাস টানে, এক একবার থামিয়া গিয়া ডাঙায় তোলা মাছের মতই চোখ কপালে তুলিয়া খাবি খায়। নীলমনির গায়ে কাঁটা দিতে লাগিল। বাতাস! পৃথিবীতে কত বাতাস! তবুও ফুসফুস ভরাইতে পারে না। অন্নপূর্ণার ভাণ্ডারে সে উপবাসী, পঞ্চাশ মাইল গভীর বায়ুস্তরে ডুবিয়া থাকিয়া ওর দম আটকাইল। মহাসংগম গল্পে জরাজীর্ণ, বিকল, অথর্ব পশুপতি বেঁচে থাকার জন্য যে উষ্ণতা প্রয়োজন, সেই খোঁজে---সকালে তাহার ঘরের সম্মুখ দিয়া যে যায় তাহাকেই সে জিজ্ঞাসা করে, রোদ উঠল গা? হ্যাঁগো দাওয়াতে রোদ এল, অ্যাঁ ?

শীতার্ত মানুষের জন্য একটু উষ্ণতার খোঁজ তার প্রায় সমস্ত ছোট গল্পেই ছড়িয়ে আছে। এই শীত জীবনের লাবণ্যকে শুষে নিতে চায়। এই শীত নরনারীর স্বাভাবিক সম্পর্কের ভেতর সন্দেহের বরফ ছড়িয়ে দেয়। গোপন জৈবিক বাসনাপূরণের ব্যর্থতায় শরীরে এই শীত নেমে আসে। অন্ধকারে ঠান্ডা সরীসৃপের মত কখনও প্রকাশ্যে, কখনও আড়ালে ভয়ংকর সেই শীতের কথা তার গল্পে ছড়িয়ে রয়েছে।

কিন্তু যা ছিল ব্যক্তিগত সংকটের নিপুণ বিশ্লেষণ, তা সে অপূর্ণ যৌনবাসনার কথা হোক বা অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার জন্য আত্মাবমাননার যন্ত্রণা হোক-- সেই বিশ্লেষণ দেখা গেল পর্বান্তরেও। গল্পের চরিত্রগুলো কিন্তু খুব একটা পালটায় নি। নিম্ন মধ্যবিত্ত মুখোশ-পরা অসহায় মানুষ, যে চেয়েছে

অবস্থার পরিবর্তন, কিন্তু সে বুঝতেই পারেনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিবর্তন সে ঘটাতে পারবে না। কখনও বুঝলেও সামাজিক অবস্থানের দায়ে উদ্যমহীন থেকেছে -- সেই চরিত্রগুলোই যেন ফিরে এল তাদের শ্রেণীচরিত্র পালটে ফেলে। কিন্তু মুখোশহীন। দ্বিচারিতা নেই, এখন আর মিডল-ক্লাস সেন্টিমেন্টের দায় নেই। বিশ্বযুদ্ধের পরে তৈরি হওয়া এই চরিত্রগুলো জানে ন্যায়, নীতি, বিবেক, আদর্শ, এমন কী ভালোবাসারও সংজ্ঞা পালটে গেছে। নিম্নবর্গের মানুষদের কোনও ভান থাকে না। যুদ্ধ, দাঙ্গা, একমুঠো ভাত, একটু থাকার জায়গা, শরীরের লজ্জা ঢাকার জন্য একটুকরো কাপড়, কালোবাজারি, নারীশরীর নিয়ে ব্যবসা--ভেঙে পড়া এই সময়ের ভেতর দিয়ে যে চরিত্রগুলো উঠে এলো, তাদের প্রাণ বড় শক্ত, তুলনায় মান অনেক নরম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর-- এইদুটো আঘাতেই আমাদের বেঁচে থাকার আড়ালে যে কদর্য খানাখন্দগুলো আমরা যে আপাতসুন্দর পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখি, মিথ্যার সে আবরণ সরে গেল। বেরিয়ে এল লোভের কুসি চেহারা। ভালোমন্দ, পাপপুণ্যের সংজ্ঞা পালটে যাচ্ছে। জল আর বাতাস ঘুলিয়ে উঠেছে থিকথিকে কাদায়। পচা গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। এই গন্ধ কোনও জৈব পদার্থ পচে যাওয়ার গন্ধ নয়, এই গন্ধ মনুষ্যত্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার গন্ধ।

আসলে ভালোভাবে বেঁচে থাকের জন্য একটা ভরকেন্দ্র থাকে। এই সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি সুস্থিত রাখার জন্য মানুষ অবিরাম লড়াই করে যায়। এই ভরকেন্দ্র যাতে টলে না যায় সেজন্য আমরা অনেক দৃশ্য দেখতে চাই না, চোখ বন্ধ করে রাখি। অনেক শব্দ শুনতে চাই না, কানে হাত চাপা দিয়ে রাখি। না হলে টালমাটাল হয়ে যায় বেঁচে থাকা। চেনা ছকের বাইরের সেই সংশয়, সংকট মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যেকটি ছোটগল্পে দেখতে পাই। মার্কসবাদে দীক্ষিত হওয়ার আগেই তার লেখক-সত্তায় তিনটে জিনিস স্পষ্ট-ই বোঝা যায়। সংশয় এবং সংকটের আবরণ ছিঁড়ে মূল কারণ খুঁজে পাওয়ার জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, বিজ্ঞানচেতনা এবং যুক্তিবাদ।

এই অস্তিত্বের সংকট বা আত্ম-পরিচয়ের সংশয়ের কারণ খুঁজে বার করতে গিয়ে লেখক একটা গল্পের কাঠামো তৈরি করেন। একটা বিশেষ সময়ে কয়েকটি চরিত্রের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, বিশেষ কোনও ঘটনার প্রেক্ষিতে তাদের প্রতিক্রিয়া, কথোপকথন, মানবিক বা প্রাকৃতিক কোনও ঘটনার বর্ণনা, একটি চরিত্র হয়তো প্রোটাগনিস্ট হয়ে ওঠে ---মানুষের অন্তর্জগতের জটিলতাকে ধরতে গিয়ে লেখক একটা জাল বিছিয়ে দেন। জালের ওপর কয়েকটি ঘটনা স্থাপিত হয়, ঘটনার কারক হিসেবে কয়েকটি চরিত্র চলাফেরা করে। এইতো সব। এ সব মিলেমিশে একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। লেখক কখনও সরাসরি মূল কারণ নির্দেশ করেন না। ওই রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটা সার অংশ থাকে, অদৃশ্য, গোপন রাসায়নিক সমীকরণ, কিন্তু ছড়িয়ে থাকে সর্বত্র। সেটুকুই ইশারা। মানুষের মনের অতলের অন্ধকারে তার দৃষ্টি খুঁজে পায় মানুষের অসহায়তা---জৈব প্রবৃত্তির কাছে, বিপন্ন সময়ের কাছে, মিথ্যে অহংকারের কাছে, আত্ম-পরিচয়ের সংকটের কাছে। এই অসহায়তার কাছে বন্দী মানুষের রি-অ্যাকশন কত বিচিত্র পথেই না হয়। অতসীমামী থেকে একটু পড়ছি :

রক্ত!

রক্ত নয় ? দেখবে? বলে মামী চলে গেল। ফিরে এল একটা গামলা হাতে করে। গামলার ভেতরে জমাট বাঁধা খানিকটা রক্ত।

মামী বললে, কাল উঠেছিল, ফেলতে মায়া হচ্ছিল তাই রেখে দিয়েছি। রেখে কোন লাভ নেই জানি, তবু

মনের কোন জটিল আবর্তের কথার দিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ইশারার তর্জনী তুলেছেন ? একটু আগেই মামী বলেছেন-- তোমাদের জ্বালায় আমি কি গলায় দড়ি দেব...রোজ তোমরা একজন না একজন এসে বাশীঁ শুনতে চাইবে। রোজ গলা দিয়ে রক্ত পড়লে মানুষ কদিন বাঁচে ?

কেন অতসীমামী যতীনমামার বাসি রক্ত গামলায় জমিয়ে রাখতেন। মানব মনের খুব গভীরে লুকিয়ে থাকা কোন প্রবৃত্তি এখানে কাজ করেছে। ফ্রয়েড, ইয়ুং পাভলভ--কার তত্ত্ব দিয়ে অতসীমামীর এই প্রবৃত্তি ব্যাখ্যা করা যাবে। আমি মনো-বৈজ্ঞানিক নই, আমাদের জন্য লেখক শুধু একটা দাগ রেখে যান। সেই দাগের ভেতরে আদিম মানুষ থেকে আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠার ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। কতটুকু বা পাল্টেছে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। সেই কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাসর্য। যা ছিল হেমলক, ফলিডল হয়ে এখন মেট্রোর থার্ড রেল দিয়ে বয়ে যায় সেই মৃত্যু। রক্ত শুনলেই তো মৃত্যুর কথা আগে মনে পড়ে। অতসীমামীর ওই রক্ত ফেলে দিতে মায়া হচ্ছিল। কেন ? যতীনমামার বাসি রক্তে কোন মায়া জড়িয়ে ছিল। জীবনের কথা কি ? এই রক্ত একসময় গরম ছিল, যতীন মামার শরীরে প্রবাহিত হয়ে উষ্ণতা দিয়েছিল সেই শরীরকে, প্রাণের লাবণ্য ছিল ওই রক্তে। তাই কি গামলাভরা ওই রক্তের জন্য অতসীমামীর মায়া জাগে। কি জানি, আমি মনস্তত্ববিদ নই, আমাদের জন্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প জুড়ে এ রকম ইশারা ছড়িয়ে রাখেন। এ ভাবেই ১৯২৮ সালে অর্থা এই সময় থেকে প্রায় আশি বছর আগে যতীনমামা আর অতসীমামীকে নিয়ে অসাধারণ একটি আধুনিক গল্প পড়ল বাংলা ভাষার পাঠক। একজন বাঁশীওয়ালা আর তার স্ত্রীর প্রেমের গোল গল্প না হয়ে অতসীমামী হয়ে উঠল নতুন ভাষা, নতুন ভঙ্গি, মানব মনের গোপন পাঠের গল্প। এ রকম গল্পের সঙ্গে বাংলা ভাষার পাঠকের পরিচয় ছিল না বললেই চলে

অতসীমামী গল্পে প্রথম চরিত্র হিসেবে এসেছে যতীনমামা। গল্পের কথক বলছেন--দরজা খুলে যে লোকটি সামনে এসে দাঁড়ালেন্ তাঁকে দেখে মনে হল ছাইগাদা নাড়তেই যেন একটা টকটকে আগুন বার হয়ে পড়ল। এই বিশেষণ মুহূর্তেই পাঠককে যতীনমামা সম্পর্কে কৌতুহলী করে তোলে। একটু পরেই যতীনমামা সম্পর্কে আবার বিশেষণ-- পুরুষেরও তা হলে সৌন্দর্য থাকে! এই বাক্যেই গল্পটি প্রথাগত গোল গল্প থেকে যোজন দূরত্বে চলে যায়। এ যাবকাল পঠিত সমস্ত গল্প, কবিতা, উপন্য্যাস, নাটক-- নারীর সৌন্দর্যই ছিল শিল্পীর বিষয়। পাঠক সেই কালিদাসের সময় থেকে অভ্যস্ত হয়েছে নারীশরীরের সৌন্দর্য বর্ণনায়। প্রবাদ হয়ে যায় তন্বী শ্যামা শিখরদশনা ইত্যাদি। প্রবাদ হয়ে যায় মোনালিসার হাসি। শ্রীরাধিকা, হেলেন অফ ট্রয়, নুরজাহান, নন্দনবাসিনী ঊর্বশী--নারীর রূপ যৌবন লীলা লাস্যের কথা চিরকাল গল্প কবিতা উপন্যাস চিত্র ভাস্কর্যের অন্যতম বিষয় এবং উপমা হয়ে এসেছে। ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু ভারতীয় শিল্পে সামান্যই। আমাদের শিল্প-সাহিত্যেও চিরকালের সেই নারী-সৌন্দর্যের মহিমা-স্তব আমাদের অভ্যস্ত করে রেখেছিল। ফলত, কোথাও পুরুষ-সৌন্দর্যের উল্লেখ সেই রচনাকে আলাদা করে তোলে। পাঠক ধাক্কা খায়। অভ্যস্ত পঠন-রীতি, বিষয় ও বিষয়ের গঠন রীতির ব্যতিক্রমী উপস্থাপনায়, এ ভাবে, আমার মনে হয়েছে ১৯২৮-এ লেখা অতসীমামী প্রথাগত নিরাপদ গোলগালগল্পের বাইরে গিয়ে পাঠককে নাড়া দিয়েছে

কিন্তু পরমূহুর্তেই পুরুষের এই ছাইগাদার নিচে জ্বলন্ত অঙ্গারের মত সৌন্দর্য স্থাপিত হচ্ছে

কুসিত একটা ফ্রেমের মাঝখানে। গল্পের কথকের বয়ান এ রকম--ইট বার করা নোনা ধরা দেওয়াল আর উইয়ে ধরা দরজা, তার মাঝখানে লোকটিকে দেখে আমার মনে হল ভারি সুন্দর একটা ছবিকে কে যেন অতি বিশ্রী একটা ফ্রেমে বাঁধিয়েছে। আগুনের মত গনগনে সৌন্দর্যের এক পুরুষকে গল্পে এনেই

তাকে দাঁড় করালেন একদম বিপরীত প্রেক্ষাপটে। এ-ও কৌশল। বোঝাই যায়, এগল্প পাঠকের মনোবাঞ্ছা পূরণের গল্প নয়। সৌন্দর্য এল, কিন্তু তার চারপাশে উইয়ে ধরা জীর্ণ কাঠামোর বন্ধন। সুন্দর আর অসুন্দরের এই দ্বন্দ্ব অতসীমামী গল্পে এর পরেও খুব কৌশলী দক্ষতায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়োগ করেছেন। গল্পের স্বাভাবিক পরিণতির দিকেই পাঠক-মনের প্রবণতা থাকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় প্রতিটি গল্পেই দেখতে পাই একটি মুহূর্ত তৈরি করে সঙ্গে সঙ্গেই বিপরীত মুহূর্ত তৈরি করছেন। ফলে পরিস্থিতির যে দ্বন্দ্ব বা সংঘাত উঠে আসছে, পাঠক মনে তার প্রতিক্রিয়া হয় আকস্মিক, অভাবিত। প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার বাইরে এই অভিজ্ঞতা। এই ধাক্কা পূর্ব-অভিজ্ঞতাকে ভেঙে দেয়। পাঠের নতুন অভিজ্ঞতায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চিহ্ণিত হন ---তিনি আলাদা।

পরের লাইনে আবার তিনি যতীনমামার পুরুষালি সৌন্দর্য ভেঙে দিচ্ছেন। ............ আমার মুগ্ধ চিত্তে কে যেন একটা ঘা দিল। কি বিশ্রী গলার স্বর! কর্কশ। কথাগূলি মোলায়েম কিন্তু লোকটির গলার স্বর শুনে মনে হল যেন আমায় গালাগালি দিচ্ছেন। এ ভাবেই অতসীমামী গল্প শুরু হয়। এ গল্প আমি অনেকবার পড়েছি, এ গল্প সম্পর্কে বিশিষ্ট আলোচকদের আলোচনা পড়েছি, আর এ গল্প নিয়ে পরবর্তী কালে লেখকের নিজস্ব মূল্যায়ন তো সবাই জানেন। কেন তিনি পরবর্তী সময়ে এই অসাধারণ গল্পটিকে উচ্ছ্বাসময়, আবেগসর্বস্ব, কাঁচা লেখা হিসেবে চিহ্ণিত করেছিলেন-- সে আলোচনা হয়তো অন্য কেউ করবেন। সে প্রসঙ্গে যাব না। আমি শুধু বোঝার চেষ্টা করেছি বিজ্ঞানচেতনা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী, প্রখর যুক্তিবাদ কলমে কালির সঙ্গে মিশিয়ে নেবার পর-ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হৃদয় এবং মস্তিষ্ক থেকে অন্য কোন অদৃশ্য কালি বেরিয়ে এসেছিল। অতসীমামী গল্পে যে বিষাদময় সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে, তাকে বোঝার চেষ্টা করি। কখনও মনে হয় জীবিত যতীনমামা নয়, মৃত যতীনমামাকে অতসীমামী চেয়েছিল।

এতো খুব সাধারণ কথা যে, তার সৃষ্টির ভেতর স্রষ্টা নিজেকেই ছড়িয়ে রাখেন। কখনও খুব স্পষ্ট ভাবেই কোনও চরিত্রের আড়ালে লেখককে দেখা যায়, কখনও অস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। অতসীমামী গল্পে যতীনমামার দারিদ্র্য, বাঁশির ভেতর দিয়ে সুর তুলে পরম কোনও সৌন্দর্যকে ছোঁয়ার জন্য জীবন উৎসর্গ করা... তার ডায়েরির ভূমিকায় যে অসুখ, আসক্তি, দারিদ্র্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যতীনমামার জীবনেও সেই তিনটি দশা লক্ষ্যণীয় ভাবে উপস্থিত। সেই অসুস্থতা, অসহনীয় দারিদ্র্য আর আসক্তি। পার্থক্য এটুকুই-- যতীনমামার সুরার প্রতি আসক্তি পরবর্তীকালে সুরের প্রতি আসক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

এই সমাপতন খুবই আশ্চর্যজনক। কারণ অতসীমামী লেখা হয়েছে ১৯২৮-এ, আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ পর্যায়ে শিল্পীসত্তার সংকট ও ভাঙনের কারণ হিসেবে ওই তিনটি বিষয়কে দায়ী করা হয়। অথচ প্রথম পর্বের অনেক গল্পেই বিষয় তিনটি ঘুরে ফিরে এসেছ। তবে মানুষের অসুস্থতা এসেছে শারীরিক এবং মানসিক --দুভাবেই।বরং মানুষের আত্ম-পরিচয়ের সংকট থেকে তৈরি অস্থিরতার ফলে মানসিক বৈকল্য চরিত্রগুলোয় অনেক বেশি। শিপ্রার অপমৃত্যু, আত্মহত্যার অধিকার, মাটির সাকী, সর্পিল, প্রাগৈতিহাসিক, শৈলজ শিলা-- প্রতিটি গল্পেই এ রকম মানুষের কথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন। প্রতিটি মানব সত্তার গভীরে রহস্যময় এক মানুষ বাস করে। ফ্রয়েড, ইউং, পাভলভ-এর তত্ত্ব দিয়েও যে রহস্যময়তাকে ছোঁয়া যায় না, লেখক সেখানে পৌঁছে যান। এই পৃথিবী, এই সংসার, এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি-রহস্য, জড় ও জীবের সম্পর্ক, অস্তিত্ব-সম্পর্কিত সংশয়--কোথায় যে মানুষ আলাদা হয়ে যায়, সেই রহস্য খুঁজ়ে দেখার দায় স্বেচ্ছায় লেখক গ্রহণ করেন। আরশোলার যেমন শুঁড়, টুয়াটারার তৃতীয় চোখ, সাপের জিভ, বাদুড়ের প্রতিফলিত তরঙ্গ গ্রহণ করার ক্ষমতা-- স্রষ্টারও তেমনই সংবেদনশীল অতিরিক্ত কোনও গ্রাহক-যন্ত্র থাকে। সংসারে যেখানে দ্বন্দ্ব, যেখানে রক্তক্ষরণ, যেখানে কান্না, মানুষ অনেক সময় নিজেও বুঝতে পারে না কেন সে গামলায় তার স্বামীর গলা থেকে উঠে আসা বাসী রক্ত রেখে দিতে চায়, যে শংকর বিশ্বাস করে মা কালীর ডাকিনী যোগিনীরা সাপ হয়ে আছে, মারলে মহাপাপ হয়--সেই শংকরের ঘরে কার্বলিক অ্যাসিডের গন্ধ---- এসব ঘটনা থেকে যে তরঙ্গ উৎসরিত হতে থাকে, লেখকের সেই গ্রাহক যন্ত্রে ঠিক ধরা পড়ে।

লেখক কেন লেখেন, কোন প্রবৃত্তি স্রষ্টাকে প্ররোচিত করে মাটি,পাথর কিংবা রঙ-তুলি নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে--এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক ভারি ভারি প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, অনেক সেমিনার হয়েছে, অনেক গবেষণা হয়েছে। সৃষ্টির এই উন্মাদনা আসলে এক নেশা। এই নেশার ঘোরে সমস্ত জীবন কেটে যায়। প্রহর শেষে কারও মনে হয় সব ব্যর্থ হয়েছে, কেউ হয়তো অনন্ত জীবন রহস্যের একটু আভাস শুধু বুঝতে পারে। বাঁশিওয়ালা যতীনমামার কথা বলতে গিয়ে শিল্পের স্বরূপ যেন একটা ছোট্ট প্যারাগ্রাফে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। এখানেও দেখি যতীনমামার সঙ্গে তার নিজের জীবনের কোথায় যেন সাদৃশ্য। যদিও শিল্পের স্বরূপ ও উদ্দেশ্য বিষয়ে পরবর্তীকালে তার দৃষ্টিভঙ্গি পালটে গিয়েছিল। প্যারাগ্রাফটা একটু পড়ছি --- কেবলই মনে হয়, নেশাকে মানুষ এত বড় দাম দেয় কেন। লাভ কি ? এই যে যতীনমামা পলে পলে জীবন উসর্গ করে সুরের জাল বুনবার নেশায় মেতে যান, মানি তাতে আনন্দ আছে। যে সৃষ্টি করে তারও, যে শোনে তারও। কিন্তু এত চড়া মূল্য দিয়ে কি সেই আনন্দ কিনতে হবে ? এই যে স্বপ্ন সৃষ্টি, এ তো ক্ষণিকের! যতক্ষণ সৃষ্টি করা যায়, শুধু ততক্ষণ এর স্থিতি। তারপর বাস্তবের কঠোরতার মাঝে এ স্বপ্নের চিহ্ণও তো খুঁজে পাওয়া যায় না। এ নিরর্থক মায়া সৃষ্টি করে নিজেকে ভোলাবার প্রয়াস কেন ? মানুষের মন কি বিচিত্র! আমারও ইচ্ছে করে যতীনমামার মত সুরের আলোয় ভুবন ছেয়ে ফেলে, সুরের আগুন গগনে বেয়ে তুলে পলে পলে নিজেকে শেষ করে আনি। লাভ নেই ? নাই বা রইল।

তা হলে, যে সৃষ্টি ভোক্তার কাছে এক দীর্ঘকালীন আনন্দের উস, তা স্রষ্টাকে দেয় শুধু ক্ষণকালের আনন্দ। সৃষ্টি কর্মে তিনি যতক্ষণ মগ্ন, ততক্ষণই তার তীব্র সুখ। তারপর সব যেন নিরর্থক মায়া। তবু ক্ষণিকের ওই সৃষ্টিসুখের উল্লাসটুকুর জন্য পলে পলে নিজেকে শেষ করে আনা। শিল্পী এবং শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গল্পেই বার্তাটুকু পাই। যে বিস্ময় তার গল্পের প্রাণ-কথা হয়ে উঠেছিল ---- মানুষের মন কি বিচিত্র, সেই ঘোষণা গল্পের কথকের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। তারও ইচ্ছে করে সৃষ্টির আগুনে নিজেকে ধ্বংস করে ফেলতে। অনুচ্ছেদের শেষ বাক্য--- লাভ নেই ? নাই বা রইল। আমার মনে হয়েছে -- এ নিরর্থক মায়া সৃষ্টি করে নিজেকে ভোলাবার প্রয়াস কেন-- এ প্রশ্ন নিজের শিল্পীসত্তার কাছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংশয় থেকেই উচ্চারিত হয়েছিল। তার প্রায় সমস্ত জীবনই তো প্রতিভার গনগনে আগুনে পুড়ে যাওয়া। পুড়ে যেতে যেতে তৈরি হয় কুবের , কপিলা, কুসুম, শশীডাক্তার, হেরম্ব, শংকর, কেতকী, মনোরমা, পশুপতি। ১৯২৮- লেখা প্রথম গল্পে যে

সংশয় থেকে মনে হয়েছিল এসব নিরর্থক মায়া, আস্তে আস্তে মানব মনের জটিল রহস্যের দিকে কেন’- এই প্রশ্ন নিয়ে তার জীবন-জিজ্ঞাসা যখন পৌঁছয়, অন্য ভঙ্গি, অন্য ভাষা, চেনা মানুষের আড়ালে অচেনা মানুষ, শরীরের প্রবৃত্তির কাছে অসহায়তা, অবদমিত যৌনতা, মুখোশ-আঁটা হিংস্রতা

এ সব নিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছয় অসাধারণ এক একটি গল্প। ঘুম ছুটে যায়, আরাম-ভঙ্গি ছেড়ে পাঠক উঠে বসে। গল্প তা হলে এ রকমও হয়। কিন্তু শুধু মনোবিজ্ঞানের তত্ত্বের কচকচি যদি হত, এ কথা তো সত্যি যে মানুষের প্রবৃত্তির ভেতর তমোগুণের দিকে ঢাল একটু বেশি গড়ানো, সেই প্রবৃত্তিকে উশকে দেবার মত গল্প যদি হত, যদি শুধু রিপু-তাড়না এবং গোপন বাসনাপূরণের বিবরণ হত--- তবে হয়তো আজ এই ঘরে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এই সভার প্রয়োজন হত না। বাংলা ভাষার মানিক না হয়ে তিনি কোনও একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হতেন। একটি সার্থক গল্পের জন্য যে যে লক্ষণের কথা বলা হয়ে থাকে, প্রায় প্রতিটি গল্পেই তার প্রতিভার ছোঁয়া, তার অন্তর্দৃষ্টি গল্পগুলিকে সেই লক্ষণ-রেখার ওপারে নিয়ে যেতে পেরেছে। গল্পের ভেতরে সমস্ত বাস্তব উপাদানের উপস্থাপনার ভেতরে ভেতরে রহস্যময় একটি কথকতা থাকে। নিঃশব্দ, অন্তঃসলিলা। পাঠকের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া একটি ইশারা। গল্পের এই সংকেতময়তা, বক্রচলন, চরিত্রের আপাত-অবোধ্য ক্রিয়াশীলতাই গল্পের নান্দনিক চমকারিত্ব, শৈল্পিক ঔকর্ষ। সে বিচারে অতসীমামী একটি সার্থক ছোটগল্প।

গল্পের মাঝামাঝি একটা লাইন পাচ্ছি-- রক্তপিপাসু বাঁশীটা ঝলকে ঝলকে মামার রক্ত পান করেছে, আমি আজ সেই বাঁশীটা কিনে নিলাম। শিল্প যে শেষ পর্যন্ত শিল্পীকে আক্রমন করে, এ তত্ত্ব স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে বিখ্যত সব শিল্পীর নিয়তি-ই এই। যে দিব্য উন্মাদনার ঘোর লেখককে প্ররোচিত করে সৃষ্টিকর্মে, সেই উন্মাদনাই শেষ পর্যন্ত লেখককে রক্তশূন্য করে দেয়। তার প্রথম গল্পেই শিল্পের এই দর্শন তার গভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রমান। আর-- আমি আজ সেই বাঁশীটা কিনে নিলাম, এই বাক্য কি তার ভবিষ্য জীবনের কোনও ঈঙ্গিত বহন করে। এই ঈঙ্গিতের কথা আমি আগেও উল্লেখ করেছি।যতীন

মামার দারিদ্র্য, অসুস্থতা, সুরের নেশায় মাতাল থেকে আরও মাতাল হতে থাকা-- এ সবই মানিক

বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের অনস্বীকার্য দশা। তফাত-এর ভেতর--- যা ছিল যতীনমামার সুরের নেশা, সে নেশা আ-কার পেয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেলায়। যে গল্প দিয়ে তার যাত্রা শুরু হল, সেখানেই আভাস পেলাম জীবন-শিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সমাপতন হলেও কোথাও যেন অস্পষ্ট আগামী দিনের ইশারা পাওয়া যায়। প্রথম গল্প থেকেই কি যতীনমামার বাঁশী তার হাতে এল।

আমাদের জীবনের মধুরতম সঙ্গীত বেদনার অশ্রুজলে গাঁথা --- বিখ্যাত বাক্যটি বাংলায় অনুবাদ করলে হয়তো অনেকটা এ রকমই হবে। বাঁশী এ গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ গল্পে

যতীনমামার একমাত্র পরিচয়-- বাঁশীবাজিয়ে হিসেবে। একজন অসাধারণ শিল্পী। গল্পের কাঠামোতে শিল্পী হিসেবে যতীনমামাকে সেই উচ্চতায় স্থাপন করার জন্য লেখক একটি অনুচ্ছেদ ব্যবহার করেছেন।

একটু পড়ছি। হঠা আমার মনে হল আমার ভেতরে যেন একটা উন্মাদ একটা ক্ষ্যাপা উদাসীন ঘুমিয়ে ছিল আজ বাঁশীর সুরের নাড়া পেয়ে জেগে উঠল। বাঁশীর সুর এসে লাগে কানে কিন্তু আমার মনে হল বুকের তলেও যেন সাড়া পৌঁছেচে। অতি তীব্র বেদনার মধুরতম আত্মপ্রকাশ কেবল বুকের মাঝে গিয়ে পৌঁছয়নি, বাইরের এই ঘর-দোরকেও যেন স্পর্শ দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছে।, আর আকাশকে বাতাসকে মৃদু ভাবে স্পর্শ করতে করতে যেন দূরে, বহুদূরে, যেখানে গোটা কয়েক তারা ফুটে উঠেছে দেখতে পাচ্ছি, সেইখানে স্বপ্নের মায়ার মধ্যে লয় পাচ্ছে। অন্তরে ব্যথা বোধ করে আনন্দ পাবার যতগুলি অনুভূতি আছে বাঁশীর সুর যেন তাদের সঙ্গে কোলাকুলি আরম্ভ করেছে।

অন্তরে ব্যথা বোধ করেও আনন্দ পাবার অনুভূতি--- মানুষের মনের গভীরে সরুমোটা অনেকগুলো তার থাকে, অনুভূতির তার। কয়েকটা ক্বচি বাজে। যতীনমামার বাঁশীর সুর সেই তার ছুঁয়ে দিলে বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, অথচ কী আনন্দ। যতীনমামার বাঁশীর সুর আর মনের সেই গোপন তারে আজ কোলাকুলি। অন্তরে ব্যথা বোধ করেও আনন্দ পাবার অনুভূতি-- একটি মাত্র বাক্যে বাঁশীওয়ালার সুরের সারাংশ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্ভুল, অমোঘ।

তেরই অঘ্রান ঢাকা মেলের কলিশনে যতীনমামা মারা যাওয়ার চার বছর পরে অতসীমামীর

সঙ্গে এই গল্পের কথকের হঠাদেখা হয়ে গেল। রেললাইনের ধারে যেখানে যতীনমামা মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করেছিলেন, অতসীমামী প্রত্যেক বছর সেখানে তীর্থ দর্শনে যান। গল্পের কথক, অর্থা ভাগ্নে

সুরেশ সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু অতসীমামী সেই নির্জন মাঠে সমস্ত রাত তার মৃত স্বামীর সঙ্গ অনুভব করেন, প্রিয়মিলনের সেই বিজন মুহূর্তে কীভাবে অন্য কেউ সামনে থাকবে।

গল্পের এ জায়গাটুকুতে একটি মাত্র লাইন-ই উজ্জ্বল। সুরেশ যখন বলে--এত রাতে তোমাকে একলা যেতে দিতে পারব না মামী, তখন মামীর চোখ জ্বলে উঠল। তীব্র নিষেধ, নিজের তৈরি জগতের ওপর বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব জগতের সংঘাতের ভয়-- তাকে প্রতিরোধ করার জন্য চোখদুটো ছাড়া জ্বলে ওঠার মত অতসীমামীর আর কীই-বা ছিল।

এ গল্পের শেষ লাইনদুটো অসাধারণ বলিষ্ঠ। গল্পের দুর্বল জায়গাগুলো যেন ভরাট করে দিয়েছে

শেষ দুটো লাইন। দরজা খুলে গাড়ি থেকে অতসীমামী নেমে যাবার পর-- আবার বাঁশী বাজিয়ে গাড়ি ছাড়ল।

আবার বাঁশী শব্দের কী চতুর প্রয়োগ। পাঠকের হঠা ধন্দ লাগে। কে বাজাল বাঁশী। অতসীমামীর জগতে বাজে একরকম বাঁশী, তার সুর ধূপের ধোঁয়ার মত সমস্ত গল্প জুড়ে অন্তর্লীন সৌন্দর্য রচনা করে, অথচ শেষ লাইনে লোহা, কয়লা, পিস্টন, বয়লার মথিত করে যন্ত্র থেকে বাঁশীর সুর উঠে আসে। আপনাদের মনে আছে হয়তো, গল্পের শুরুতেই যতীনমামার চেহারার অনুপম সৌন্দর্যের

বর্ণনা করেই লেখক তাকে দাঁড় করিয়েছিলেন কুসিত, জীর্ণ একটা ফ্রেমের মাঝখানে। আর সুরের আগুনে এই মানুষটার পুড়ে যাওয়ার ইশারা ছিল ছাইগাদার নিচে টকটকে আগুনের উপমায়। আবারও

বৈপরীত্য এসেছিল এই সুন্দর মানুষের কন্ঠস্বরে। কী বিশ্রী কর্কশ আওয়াজ। গল্পের শেষেও কল্পজগআর বস্তুজগতের বৈপরীত্যের কী অসাধারণ প্রয়োগ। যন্ত্র-জগ থেকে নেমে অনেক দূরে কল্পলোকে চলে যাচ্ছে সুরেশের অতসীমামী। এক মিথ্যে পৃথিবীর দিকে। অতসীমামীর হাতে বাঁশের বাঁশী। সেই মুহূর্তেই যন্ত্রের বাঁশী বেজে ওঠে। ঘোর বাস্তব, কঠিন পৃথিবীর বাঁশী। এই দ্বন্দ্ব তার লেখায় চিরকাল ছিল।

অতসীমামী একটি সার্থক, কিন্তু নিখুঁত গল্প নয়। টুকরো টুকরো অংশগুলো জুড়ে গোটা গল্পটি

দৃঢ়তা পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকটি অংশ সমান শক্তিশালী নয়। অতসীমামীর বাঁশী বাজানো, বউকে

না দিয়ে নিজে রসগোল্লা খাচ্ছেন-- সেই লজ্জায় কি বিশ্রী রসগোল্লা এই ছলটুকু করা, সকালসন্ধ্যা গড় হয়ে স্বামীকে প্রণাম করা--- মূল চরিত্রদুটির যে স্বাতন্ত্র্য তৈরি করা হয়েছে, তার সঙ্গে যেন মানানসই নয়। বিশেষ করে ট্রেনের কামরায় অতসীমামীর হঠাঅপূর্ব দক্ষতায় বাঁশী বাজানো অংশটুকু না থাকলে কোনও ক্ষতি হত না। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে মহিলাদের পক্ষে বাঁশী বাজানো খুবই বিরল ঘটনা। বাজনার বর্ণনা থেকে ধরে নিতে হয় অতসীমামী অত্যন্ত দক্ষ বাজিয়ে। দুটো লাইন পড়ছি--- আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। এ তো অল্প সাধনার কাজ নয়। যার তার হাতে বাঁশী তো এমন অপূর্ব কান্না কাঁদে না! শাস্ত্রীয় যন্ত্রসঙ্গীত-চর্চা বিষয়ে আমার সামান্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে মানের বাজিয়ে হিসেবে অতসীমামীকে এঁকেছেন, অন্তত দশ বারো বছরের নিবিড় সাধনা ছাড়া সেই মানের শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু গল্পে পাচ্ছি বিয়ের পর কিছুটা শখেই যতীনমামার কাছে তিনি বাঁশী শিখেছিলেন। শুধু তাই নয়, মাঝে সাতটা বছর কেটে গেছে রেওয়াজহীন, অথচ অতসীমামীর বাদন-দক্ষতা একটুও কমেনি। এ রকম হয় না। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি সাতদিন চর্চার অভাবেই বাজনার মান নেমে যায়, সাত বছর তো দূর অস্ত। আরও দু একটা আলগা লাইন রয়েছে এ গল্পে, কিন্তু আর যাই হোক, অতসীমামী উচ্ছ্বাসময় গল্প নয়।

চরিত্রের দু একটি মাত্রাকে ধারালো করতে গিয়ে রঙ একটু চড়া হয়ে গেছে, তবু সব মিলিয়ে অতসীমামী দৃঢ়-সম্বদ্ধ গল্প। উচ্ছাসময় বা নিছক পাঠকের মন ভোলানো গল্প নয়।

তার পর্বান্তর চিহ্ণিত করা হয় কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করাকে। শুধু দলীয় সমর্থক নয়, পার্টির মেম্বার। পরিবর্তিত পারিপার্শ্বিকতা, নাকি পার্টির দায়িত্বশীল সাংস্কৃতিক কর্মী--কোন তাড়নায় জীবন সম্পর্কে, শিল্প সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। শিল্পসাহিত্যের ওপর পার্টির আমলাতান্ত্রিক মনোভাব,নাকি সমষ্টির কথা বলতে গিয়ে হারবার্ট রীড কথিত সেই ব্যাপারটাই ঘটেছিল।

The collective mind is like water that seeks lowest level of gravity.

সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী কোনও শিল্পী, যার রয়েছে প্রখর অন্তর্দৃষ্টি, জীবনের প্রতি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবতাবোধ--- শুধুমাত্র বিশেষ একটি রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী হওয়ার জন্য তার লিখন-শৈলীর বৈশিষ্ট্য কি পালটে যেতে পারে। বিষয় পালটায়, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পালটায়, কিন্তু মানব মনের গোপন অলিগলিতে যে জট পাকিয়ে থাকে, লেখক ছাড়া তাকে স্পর্শ করবে কে। সমকালীন সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতেও চিরকালীন জীবনের কথা উঠে এসেছে যে সাহিত্যে, সেই সাহিত্যই ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। দেবেশ রায়-এর কথায় বলা যায়--- মাহেন্দ্রক্ষণে প্রয়োজনীয় পাঠের নির্ভুল উঠে আসাই ক্লাসিকের সনাতন লক্ষণ।

যখন বলা হচ্ছে তার প্রতিভার দীপ্তি, সৃজনী শক্তির ক্ষয় শুরু হয়েছে, কেউ কেউ বলছেন --- সমাজপ্রেক্ষিতের ওপর জোর দিতে গিয়ে মনের জগ হারিয়ে গেছে অতি সরলীকরণে, সেই সময়ে পাওয়া গেল হারানের নাতজামাই এবং ছোট বকুলপুরের যাত্রী। ১৯৪৮ এবং ১৯৪৯-এ।

কম্যুনিস্ট লেখক এবং অ-কম্যুনিস্ট লেখকের কাছে আমাদের আলাদা করে কী কী প্রত্যাশা থাকে। প্রথম জন শুধু জনগনের সংগ্রামী ঐক্যের কথা, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কথা, শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার কথা লিখবেন? তাকে বলা হবে সৎ-সাহিত্য ? প্রগতিশীল রচনা ? আর অন্যজন জনগণের সুখদুঃখের কথাকে ভাষা না দিয়ে, নিম্নবর্গের মানুষের বেঁচে থাকায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কথা এড়িয়ে, মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে শুদ্ধ শিল্পের চর্চা করে যাবেন। এ রকম একটা মোটা দাগের বিভাজন রেখার কথা শোনা যায় বটে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পর্বের লেখালেখি নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। অনেকেই বলেছেন লেবেল-আঁটা গল্প। সৃজন-ক্ষমতা কমে গেছে ইত্যাদি। অথচ এই পর্বের গল্পগুলোয় সমকালীন পটভূমিতে দুর্গত মানুষের কথা বলতে গিয়ে শিল্পের ঔকর্ষ্য যে বিন্দুমাত্র কমেনি, তার লক্ষণ গুপ্তধন, কুষ্ঠরোগীর বৌ, শিল্পী, গায়েন, হারানের নাতজামাই, ছোট বকুলপুরের যাত্রী, হলুদপোড়া গল্পগুলোতে ছড়িয়ে আছে। আমি শুধু এ কথাই বলার চেষ্টা করেছি মার্কসবাদে দীক্ষিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো বদলে গিয়েছিল, কিন্তু -- কি বিচিত্র মানুষের মন, অতসীমামী গল্পের এই উপলব্ধি এবং সেই বিচিত্র মনের স্বরূপ উদঘাটনে তার তীব্র অন্তর্দৃষ্টি পরবর্তী পর্যায়ের গল্পগুলোকেও উজ্জ্বল করেছে। একজন মার্কসবাদী লেখক হাজার বছরের বঞ্চনার বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কথা লিখেছেন বলেই সেই বিভাজন রেখার ওপারে থাকবে তার সৃষ্টি। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের গল্প কি শিল্পের সমস্ত শর্ত অনুযায়ী অসাধারণ একটি গল্প হয়ে উঠতে পারে না। সার্থক গল্প কাকে বলে বিচার করবে কে ? ভারী সমালোচক, শিল্প-সাহিত্যের সরকারি তত্বাবধায়ক, পাঠক, নাকি লেখক নিজেই ঘোষণা করবেন যে তার মতে এটি একটি সার্থক গল্প। জনপ্রিয় গল্পকে কি সব সময় সার্থক গল্প বলা যাবে। পাঠকের ইচ্ছাপূরণের সহজ গোলগল্প সহজেই জনপ্রিয়তা অর্জন করে।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সে রকম গল্প কোনও দিনই লেখেননি। বিভূতিভূষণ বা তারাশঙ্করের মত পাঠক-আনুকূল্য পাননি, প্রকাশকের দাক্ষিণ্য সেভাবে জোটেনি। তবু বাংলাসাহিত্যে তিনি এক অনন্য বন্দ্যোপাধ্যায়। অতসীমামী থেকে শুরু করে কুষ্ঠরোগীর বৌ, হলুদপোড়া হয়ে হারানের নাতজামাই, ছোট বকুলপুরের যাত্রী পেরিয়ে চিকিৎসা পর্যন্ত খুব দ্রুত সমাজ, মানুষ এবং সময়কে বদলে যেতে দেখেছিলেন তিনি। বিজ্ঞান-মনস্কতা, সময়-সচেতনতা, ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক বিষয়ে কৌতূহল, চাওয়াপাওয়ার টানাপোড়েনে হেরে যাওয়া মানুষের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা পিছিয়ে পড়া মানুষ, পর্ব বা পর্বান্তরের প্রশ্ন নেই, মার্কসবাদী কি অ-মার্কসবাদী, সে কথা বলার কী দরকার--- গল্পগুলোয় তো ঝিলিক দিয়ে উঠেছে প্রখর আলো। যে মানুষগুলো জোট বাঁধছে, তাদের তো ব্যক্তি-পরিচয়হীন শুধুমাত্র সমষ্টির অন্তর্গত একটি অস্তিত্ব হিসেবে চিহ্ণিত করেন নি। তাদের মনের গহনেও ডুব দিয়েছেন। তাদেরও সামাজিক একক হিসেবে ব্যক্তি-সংকটের কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। মার্কসীয় তত্ত্ব কীভাবে এসেছিল তার দ্বীতিয় পর্বের গল্পে। স্লোগানের মত চিকৃত ছিল কি ? যান্ত্রিকভাবে উপস্থাপিত করেছিলেন কি ? নাকি শিল্পের শর্ত মেনেই জীবনের সঙ্গে তত্ত্বকে যুক্ত করেছিলেন। কীভাবে এসেছিল যুদ্ধ, মন্বন্তর, কালোবাজারি, খাদ্যসংকট, বস্ত্রসংকট, তেভাগা আন্দোলন ।

হারাণের নাতজামাই থেকে একটা লাইন উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছিনা। সে রাতে হারাণের ঘরে ভুবন মন্ডল এসেছিল। গাঁ শুদ্ধ লোক যাকে আড়াল করে রাখে, হঠা হানা দিয়েও পুলিশ যার নাগাল পায় না। কিন্তু কেউ পুলিশকে খবর দিয়েছিল। জানতে পেরে চাষীদের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, অসাধারণ একটি শিল্পসম্মত বাক্যে মানিক সেটি লেখেন। শীতের তে-ভাগা চাঁদের আবছা আলোয় চোখ জ্বলে ওঠে চাষীদের। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতায় হাজার হাজার বছর ধরে চাঁদের কত উপমা দেওয়া হল। সারাদিন ধান কাটার পরিশ্রমে শীতের রাতে চাষীরা অঘোরে ঘুমোয়। সেই সোনার ফসলই যেন এক- তৃতীয়াংশ হয়ে আকাশে ভেসে আছে। এ গল্প তো তে-ভাগা আন্দোলনেরই। এমন ভাবে চাঁদ, ফসল আর মানুষের ক্রোধের সিনক্রোনাইজেশন আর কোথাও পাইনি আমরা। চাঁদের এমন উপমা এ গল্পের পটভূমিতে আর কি হতে পারত। হারাণের নাতজামাই তে-ভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে চাষীদের ফসল রক্ষার লড়াই-এর গল্প। সমবেত প্রতিরোধ, প্রতিবাদের গল্প। অথচ আমার কাছে গল্পটি বিশেষ মাত্রা পেয়েছে, শৈল্পিক আবেদন অনুভব করেছি রেইডিং পার্টির নায়ক মন্মথ আর হারাণের আসল নাতজামাই জগমোহন-- এই চরিত্রদুটির কথা ভাবতে গিয়ে। আমার মনে হয়েছে পুরো গল্পটার ভরকেন্দ্র রয়েছে গল্পের শেষে, যেখানে ময়নার থুতনি ধরে আদর করবে বলে মন্মথ হাত বাড়ালে জগমোহন বাঘের মত গর্জন করে উঠেছিল---মুখ সামলাইয়া কথা কইবেন। সন্ধেবেলা এই জগমোহন তার বউ ময়নাকে বলেছে--তোমার লগে আইজ থেইকা শেষ। ভুবন মন্ডলের সঙ্গে একঘরে তার বউ সেজে ময়না ছিল। মন্মথর চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য সামান্য সময় ঝাঁপ বন্ধ করেছিল। সেই দোষে জামাই শাশুড়িকে কথা শুনিয়েছে---ব্রক্ষ্মান্ডের মাইনষে জানছে কার লগে শুইছিল। চোখে দেইখা গেছে দুয়ারে ঝাঁপ দিয়া কার লগে শুইছিল। পরে ময়না যখন কাঁদে, জগমোহন বিদ্রূপ করেছিল---ঝাঁপ দিছিলা, শোও নাই, বেউলা সতী। অথচ মন্মথ যখন ময়নাকে অশ্লীল কথা বলে, থুতনি ধরতে হাত বাড়ায়, সেই মুহূর্তে জগমোহন বুঝতে পারে এই নারীকে রক্ষা করার দায়িত্ব তার। অবচেতনেই

শ্রেণী-চেতনা কাজ করে। কাস্তে হাতে না নিয়েও সংগ্রামী ভূমিকায় অংশগ্রহণ করে। সমস্ত গল্পের ভেতরে সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত আমার কাছে জগমোহনের গর্জন। ওই একটি গর্জনে ভুবন মন্ডলসহ তে-ভাগা আন্দোলনের সমস্ত কৃষকের সঙ্গে সে যুক্ত হয়। আর গল্পটি একজন মার্কসবাদী লেখকের কৃষক আন্দোলনের গল্প ছাড়িয়ে ব্যক্তি-মানুষের সংকট ও তার বিচিত্র প্রতিক্রিয়ার গল্প হয়ে ওঠে।

আমি মোটমাট বলার চেষ্টা করেছি একক মানুষের অস্তিত্ব-সংকটের গল্প হোক, আর সমষ্টির প্রতিবাদী চেতনার গল্প হোক, মানুষের মনের গহনে যে রহস্যময়তার খোঁজ়ে অতসীমামী থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল, দুটি পর্বের গল্পেই সেই খোঁজ জারী থেকেছে। আর মূলত এ কারণেই দ্বিতীয় পর্বের গল্পগুলোও বিষয় ভাবনায় একপেশে হলেও শুধু তত্ত্বে ভারাক্রান্ত বা উচ্চকিত স্লোগান না হয়ে শিল্পগত ভাবেও সফল বলে আমি মনে করি।

বিপুল দাস,৫৪,শক্তিগড়,রোড-২, শিলিগুড়ি-৭৩৪০০৫, ফোন-(০৩৫৩)২৪৬৮১৮৩/৯৪৭৫০৮৯৫০০